▍দ্বিতীয় অংশ
দীর্ঘমেয়াদি নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধির প্রাথমিক শক্তি আসে গভীর ঘুম থেকে। রাতের প্রথম ভাগে যখন শিশু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখন পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে হিউম্যান গ্রোথ হরমোন বা এইচজিএইচ নিঃসৃত হয়, যা হাড় ও মাংসপেশির স্বাভাবিক গঠনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। রাত জাগার কারণে এই হরমোন নিঃসরণে বিঘ্ন ঘটে, ফলে শিশুর স্বাভাবিক উচ্চতা ও ওজন বৃদ্ধি থমকে যেতে পারে। ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর তথ্যমতে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শিশুদের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া এলোমেলো করে দেয়। এর ফলে শরীরে লেপটিন ও গ্রেলিন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে শিশুবয়সেই স্থূলতা বা অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। শিশুর স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা এবং মনোযোগের সঙ্গে ঘুমের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশটি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে শিশু পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না এবং যা শেখে তা দ্রুত ভুলে যায়। বিভিন্ন চিকিৎসা সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু নিয়মিত
দেরিতে ঘুমাতে যায়, তাদের মধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং অহেতুক রাগ বা মেজাজ খিটখিটে হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঘুমের ঘাটতি শিশুদের মেধা, শিশুমস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগ বা সিন্যাপ্স দুর্বল করে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগের ঘাটতিজনিত ব্যাধি বা এডিএইচডি-এর মতো সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর রাত জাগার নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ঘুমের সময় মানবদেহে সাইটোকাইন নামক এক ধরনের প্রোটিন নিঃসৃত হয়, যা যেকোনো সংক্রমণ ও প্রদাহের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলে। নিয়মিত রাত জাগলে রক্তে এই প্রতিরক্ষামূলক সাইটোকাইনের মাত্রা কমে যায়, ফলে শিশুরা খুব সহজেই ঠাণ্ডা, সর্দি, কাশি ও অ্যালার্জিসহ নানা সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, শৈশবে ঘুমের ঘাটতি পরবর্তী বয়সে রক্তচাপ বৃদ্ধি, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের পূর্বলক্ষণ তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। বাচ্চাদের রাত জাগার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে স্মার্টফোন, টেলিভিশন ও ট্যাবলেটের অতিরিক্ত ব্যবহারকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডিজিটাল স্ক্রিন
থেকে নির্গত নীল আলো বা ব্লু লাইট মানবদেহে মেলাটোনিন নামক ঘুম হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়। ফলে শিশুরা স্বাভাবিক ঘুমের বার্তা পায় না এবং দেরিতে ঘুমায়। আন্তর্জাতিক শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ-এর মানসিক স্বাস্থ্য বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব শিশু প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমায় না, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা, উৎকণ্ঠা ও সামাজিক মেলামেশায় বিমুখতার লক্ষণ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ১ থেকে ২ বছরের শিশুর দৈনিক ১১-১৪ ঘণ্টা, ৩ থেকে ৫ বছরের শিশুর ১০-১৩ ঘণ্টা এবং ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের নিয়মিত ৯-১২ ঘণ্টা নিশ্চিন্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের সুস্থ রাখতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ রাখা উচিত। যদি কোনো শিশু টানা অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যায় ভোগে, তবে অবহেলা না করে অভিজ্ঞ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা চাইল্ড সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের মেধা: তথ্যসূত্র ও পারমালিংক: ১. স্লিপ ফাউন্ডেশন - শিশুদের ঘুমের গাইডলাইন | ২. সিডিসি - চাইল্ডহুড স্লিপ অ্যান্ড হেলথ | ৩. ডব্লিউএইচও - শিশু স্বাস্থ্য ডিরেক্টরি