▍দ্বিতীয় অংশ
প্রতিবার নতুন সভাপতি একটি ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে আসেন। এই কর্মসূচিকে আলাদা করে তোলা মূল বিষয়বস্তু নয়; কারণ - শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু কার্যক্রম, মানবাধিকার ও মানবিক সুরক্ষা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং বহুপাক্ষিকতার সংস্কার; এগুলো জাতিসংঘের পরিচিত শব্দভাণ্ডার। এই অধিবেশনের প্রকৃত প্রশ্ন এই নয় যে, ড. রহমান কী-কী অগ্রাধিকার দিতে চান, বরং প্রশ্নটি হলো - সাধারণ পরিষদ একটি বিশ্ব মঞ্চ বা বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আদৌ কোন ক্ষমতা রাখে কিনা? জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতির ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো আগামী বারো মাসে কাঠামোগতভাবে অর্জনযোগ্য হবে কিনা তা নির্ভর করবে বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, বৈশ্বিক চাহিদা ও আচরণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রবলয়ের ভূমিকা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ধরণ ও আন্তরিকতার উপর। মূল সংকট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম অভূতপূর্ব বিশ্ব অস্থিরতা বিশ্ব আজ তার যৌথ ইতিহাসের আরেকটি সংকটময় অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। সশস্ত্র সংঘাত, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মানবিক সংকট, জলবায়ু জরুরি অবস্থা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস এমন সব চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে যা কোনো দেশের পক্ষেই একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এমন একটি নির্ধারণী মুহূর্তে, জাতিসংঘ আজও এমন একটি অন্যতম বিশ্বমঞ্চ যেখানে দেশগুলো একত্র হয়ে আলোচনা করতে এবং যৌথ সমাধান খুঁজতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে। প্রধান আলোচনাকারী, নীতিনির্ধারক ও প্রতিনিধিত্বকারী অঙ্গ হিসেবে সাধারণ পরিষদ ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসে, যেখানে প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি জাতিসংঘের একমাত্র অঙ্গ যেখানে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র সমান মর্যাদায় অংশগ্রহণ করে। এর দায়িত্বের পরিধি শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, মানবিক বিষয়াবলি, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং জাতিসংঘের বাজেট পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পটভূমিতে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান ছয়টি মূল অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছেন: ১) শান্তি ও নিরাপত্তা; ২) টেকসই উন্নয়ন; ৩) জলবায়ু পদক্ষেপ; ৪) মানবাধিকার ও মানবিক বিষয়াবলি; ৫) প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI); ৬) বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন যদিও এই অগ্রাধিকারগুলো আমাদের সময়ের জরুরি প্রয়োজনীয়তাগুলোকে প্রতিফলিত করে, তবে মূল প্রশ্ন থেকেই যায়: সাধারণ পরিষদ কি এসব অঙ্গীকারকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারবে, নাকি বৈশ্বিক অস্থিরতা এই বাস্তবায়নকে থমকে দেবে? বর্তমান
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে প্রতিটি অগ্রাধিকার বিশ্লেষণ করলে বাস্তবায়নের একটি পরিষ্কার পথরেখা পাওয়া যায়। ছয়টি অগ্রাধিকারের বিশ্লেষণ: অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নে রূপান্তর: ১. শান্তি ও নিরাপত্তা: সংকটের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ওপর জোর শান্তি ও নিরাপত্তা জাতিসংঘের মূল লক্ষ্যের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, অথচ নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারে প্রায়শই আন্তর্জাতিক ঐক্যমত অচল হয়ে পড়ে। এই অগ্রাধিকারকে বাস্তবে রূপ দিতে সংঘাত ঘটার পর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে আগাম সংঘাত প্রতিরোধ, দ্রুত মধ্যস্থতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সাধারণ পরিষদের সম-অধিকারের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে - যেখানে কোনো একক দেশের ভেটো ক্ষমতা নেই - জাতিসংঘ রাজনৈতিক সংলাপ, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং সংকট বড় আকারের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেওয়ার আগেই শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। ২. টেকসই উন্নয়ন: বাস্তবায়নের ঘাটতি পূরণ অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অগ্রাধিকারকে দৃশ্যমান অগ্রগতিতে পরিণত করতে হলে জাতিসংঘকে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে সম্পদ প্রদানে জোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি বৈষম্য হ্রাস, বৈশ্বিক বাজারে সবার সমান প্রবেশাধিকার এবং কেবল অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে নয়, বরং মানুষের মর্যাদা ও স্থিতিস্থাপকতার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন পরিমাপের দাবি রাখে। ৩. জলবায়ু পদক্ষেপ: দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো হুমকি নয়; চরম আবহাওয়া প্রতিনিয়ত বহু বছরের উন্নয়ন অগ্রগতি ধ্বংস করে দিচ্ছে। জলবায়ু লক্ষ্যকে পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হলে কেবল নামমাত্র অঙ্গীকার থেকে বেরিয়ে এসে বাধ্যতামূলক জবাবদিহিতা, 'ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি' (Loss and Damage) তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ সুরক্ষাকে যুক্ত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু পদক্ষেপ একটি টিকে থাকার লড়াই। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ন্যায়বিচার ও সম্পদ হস্তান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সাধারণ পরিষদকে কাজ করতে হবে। ৪. মানবাধিকার ও মানবিক সাড়াদান: মানুষকে প্রাধান্য প্রদান বৈশ্বিক সংঘাত প্রতিনিয়ত লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে, যা শরণার্থী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে মৌলিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে। মানবাধিকার নীতিগুলোকে বাস্তব সুরক্ষায়
রূপান্তর করতে মানবিক সহায়তাকে ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে মুক্ত করতে হবে। জাতিসংঘকে নিশ্চিত করতে হবে যেন আন্তর্জাতিক আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয় - কোনো দ্বিমুখী নীতি ছাড়াই - যাতে সংঘাত যেখানেই ঘটুক না কেন মানবিক সহায়তা ও তহবিল সুরক্ষিত থাকে। ৫. প্রযুক্তি ও এআই শাসন: ডিজিটাল বৈষম্য প্রতিরোধ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রাখে, তবে কয়েকটা ধনী দেশের হাতে প্রযুক্তি সীমাবদ্ধ থাকলে তা বৈশ্বিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এই অগ্রাধিকারকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হলে নতুন প্রযুক্তির জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এআই নীতি নির্ধারণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রযুক্তিকে বৈশ্বিক বিভাজনের কারণ না বানিয়ে যৌথ অগ্রগতির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ৬. বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন: সাফল্যের মূল নিয়ামক পূর্ববর্তী পাঁচটি অগ্রাধিকারের সফলতা সম্পূর্ণভাবে জাতিসংঘের নিজস্ব সংস্কার এবং ভাবমূর্তির ওপর নির্ভর করছে। যখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অকার্যকর বা পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করে, তখন বহুপাক্ষিকতা ব্যর্থ হয়। এই অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জোরালো কণ্ঠস্বর প্রদান করা প্রয়োজন। আস্থা পুনর্গঠন কেবল কোনো প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মূল শর্ত। বাস্তবায়নের ব্যবধান কমানোর উপায় ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের এই ছয়টি অগ্রাধিকার বর্তমান বিশ্ব সংকট মোকাবিলার জন্য একটি সুসংগঠিত কাঠামো প্রদান করে। নিরাপত্তা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে, উন্নয়ন জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ায়, জলবায়ু স্থায়িত্ব মানবিক সংকট কমায় এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি এই সবগুলোকে গতিশীল করে। তবে কেবল ঘোষণাপত্র প্রকাশ বিশ্ব অস্থিরতা সমাধান করতে পারবে না। ৮১তম অধিবেশন তখনই এই ছয়টি অগ্রাধিকারকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারবে, যখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো সাধারণ পরিষদের গণতান্ত্রিক মঞ্চকে - যেখানে প্রতিটি দেশের সমান ভোট রয়েছে - রাজনৈতিক ঐক্যমত তৈরি, আর্থিক সম্পদ সংস্থান এবং যৌথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করবে। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল, তবে রাজনৈতিক মানসিকতা এবং বহুপাক্ষিক উদ্যোগের মাধ্যমে জাতিসংঘ এই ছয়টি অগ্রাধিকারকে একটি স্থিতিশীল বিশ্বের জন্য বাস্তব সমাধানে রূপান্তর করতে পারে যদিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অতীত সাফল্য খুবই নগন্য।