অদম্য চেতনার প্রতীক: ডা. শফিকুর রহমান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহাসিক মোড়

বাংলাদেশ, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুগামী। ধর্ম, বর্ণ ও দল নির্বিশেষে এখানকার মানুষ একে অপরকে আপনজন হিসেবে গ্রহণ করে, যা আমাদের ঐক্য ও বন্ধুত্বের অনন্য প্রতীক। কিন্তু সেই ঐক্য ও বন্ধুত্বের মাঝেও রাজনৈতিক ইতিহাসের আঁধারময় সময় ছিল যখন দেশের সুসংগঠিত একটি ইসলামী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বন্দি হয়ে ফাঁসিকাষ্ঠে হারিয়ে গেল।
শুধু কারাগারের অন্ধকার প্রাসাদ নয়, সেই সময় রাজপথেও সেই দলের আদর্শিক উত্থান ঠেকেছিল এক গাঢ় রাজনৈতিক সংকটে। সেই সংকটময় সময়ে উঠে এলেন এক ব্যক্তিত্ব — ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক, যিনি রাজনীতির গ্ল্যামারের বাইরে থেকে দলকে নতুন দিশা দেখালেন। নীরবে, ধৈর্যের সঙ্গে নেতৃত্বের নতুন পাঠ দেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমানের জীবনের শুরু সিলেটের সরল জনজীবন থেকে। মেধাবী ছাত্র থেকে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণ কর্মী, তারপর প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। কিন্তু সব সময় তার লক্ষ্য ছিল মানুষের সেবা, তাদের দুর্দশা কমানো এবং ন্যায়বিচারের পথে লড়াই করা। রাজনীতি ছিল তার কাছে একটি ‘পবিত্র দায়িত্ব’, সমাজ বদলের জন্য এক নীরব বিপ্লব।
২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারকালে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ যখন সবচেয়ে অস্থির, তখন জামায়াতে ইসলামীর প্রায় সব শীর্ষ নেতৃত্ব দিশেহারা। সেই সময় ডা. শফিকুর রহমানের ধৈর্যশীল, কৌশলগত নেতৃত্ব দলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে, নতুন করে সংগঠিত করার পথ দেখায়। ২০১৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির নির্বাচিত হন, যদিও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার নেতৃত্ব ছিল অনেকাংশে ‘নীরব’ ও আড়ালে।
কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখ তাকে ও তার আদর্শকে মেনে নিতে পারেনি। ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর গভীর রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে জঙ্গিবাদে অর্থায়নের মিথ্যা অভিযোগে বন্দি করা হয়। যদিও প্রমাণহীনতার কারণে এটি ছিল একটি সাজানো মামলা, যার উদ্দেশ্য ছিল দলের শক্তি দুর্বল করা এবং রাজনৈতিক চেতনাকে নির্মূল করা।
তবু কারাগারের দেয়ালও আটকাতে পারেনি তার বিশ্বাস ও আদর্শকে। বন্দি অবস্থায়ও তিনি কর্মীদের প্রেরণা জুগিয়েছেন, ‘বিজয় আসবেই’ বলে নতুন আশা দিয়েছেন। এবং সেই বিজয় আসতেই বাধ্য। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যখন অধিকার আদায়ে জেগে উঠে, তখন তার সংগ্রাম ও ত্যাগের মূল্যায়ন হলো।
ডা. শফিকুর রহমানের গল্প শুধু একজন ব্যক্তির নয়; এটি এক অদম্য চেতনার গল্প। যে চেতনা শেখায়, সত্য ও ন্যায়ের পথে ধৈর্য ধরে চললে, অন্ধকার যতই গভীর হোক, একদিন ভোরের আলো ফুটবেই। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি— আদর্শ ও সাহস কখনো হারায় না, তারা সময়ের স্রোতে গৌরবোজ্জ্বল হয়ে থাকে।
এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সত্যিকারের নেতৃত্ব হলো কঠিন সময়েও দমে না যাওয়া, এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য অবিচল সংগ্রাম। ডা. শফিকুর রহমানের অবদান সেই সাহস ও প্রত্যয়ের অসীম প্রতীক।