গণ-জাগরণ এবং এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম: রাজনীতির পুরোনো অধ্যায় কি তবে সমাপ্ত?

১৪ আগস্ট, ২০২৫ - সকাল ৮:৫০
 2  14.4k
গণ-জাগরণ এবং এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম: রাজনীতির পুরোনো অধ্যায় কি তবে সমাপ্ত?
গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পরও রাজনৈতিক আকাশে নীরবতা—নতুন শক্তির অপেক্ষায় বাংলাদেশ

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নীরব বিপ্লব—BIGD জরিপে অর্ধেকের বেশি ভোটারের অনিশ্চয়তা ও নতুন রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাবনা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে আজ যে নীরবতা বিরাজ করছে, তা কোনো কৌশলগত শান্তি নয়, বরং এক গভীর গণহতাশার প্রতিফলন। এটি কোনো স্লোগান বা মিছিলে প্রকাশিত হয় না; বরং দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা অসন্তোষের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে উপস্থিত।

 দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতিতে যে বিভেদের দেয়াল দৃঢ় ছিল, তা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রলয়ংকরী ঢেউয়ে প্রায় ভেঙে গেছে। এই গণঅভ্যুত্থান, যা শুরু হয়েছিল চাকরি কোটা সংস্কারের দাবিতে, দ্রুত একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয় এবং ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করে।

এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক বছর পর, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অফ গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BIGD) একটি জরিপ পরিচালনা করে, যা দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।

জরিপে দেখা যায়, ৪৮.৫% ভোটার এখনও তাদের পছন্দের রাজনৈতিক দল নির্ধারণ করতে পারেননি, যা আগের জরিপের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এই অনিশ্চয়তা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সংস্কারের প্রতি অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।

এই পরিস্থিতিতে, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী তাদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP), যা ছাত্রনেতাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের সমর্থক বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। অন্যদিকে, বিএনপি ও জামায়াত-এর সমর্থন কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, যদিও তারা এখনও নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে "জুলাই সনদ" গৃহীত হয়েছে, যা সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য একটি রূপরেখা প্রদান করে। এই চুক্তির মাধ্যমে, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি নতুন দিশা নির্ধারণের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটি কেবল একটি নির্বাচনের পালাবদল নয়, বরং এটি একটি জাতির মনের পরিবর্তনের মুহূর্ত। এই নীরব বিপ্লবের ঢেউ কোন দিকে বইবে, তা হয়তো এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এটি নিশ্চিত যে, দেশের মানুষ আজ এক নতুন বাংলাদেশ চায়—একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা পালাবদলের এক বছর পরও দেশের রাজনীতিতে এক গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে । তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর গণমানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনে ক্ষমতা গ্রহণ করেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি টাইম ফ্রেম ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে এক বছর পর, BIGD-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে—দেশের ৪৮.৫% ভোটার এখনও কোনো নির্দিষ্ট দলকে বেছে নিতে পারেননি এবং ১৪.৪% তাদের পছন্দের কথা জানাতে রাজি হননি। তাহলে কি দেশের অর্ধেকেরও বেশি ভোটার বর্তমানে প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার প্রতি কোনো আস্থা রাখতে পারছেন না?

এই বিশাল জনসমুদ্র কেবল নীরব দর্শক নন, বরং পরিবর্তনের শক্তিশালী নিয়ামক। তারা পুরোনো স্লোগান বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিশ্বাসী নন, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সুশাসনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেন। এই নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনৈতিক অবস্থানই আগামী দিনের বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে।

এই নীরব বিপ্লবের কারণ খুঁজতে গেলে প্রধান দলগুলোর কৌশলগত ভুল এবং মৌলিক দাবি পূরণে তাদের ব্যর্থতা সামনে আসে। নির্বাসিত চিকিৎসক, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক ড. পিনাকী ভট্টাচার্য সম্প্রতি তার এক ইউটিউব ভিডিওতে বিএনপির কৌশলগত দুর্বলতার বিশ্লেষণ করেছেন।

তিনি বলেন, “যখন একটি দল তার মূল আদর্শ থেকে সরে এসে অন্য দলের ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে, তখন তা নিজস্ব ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এটি এক ধরনের আত্মঘাতী কৌশল।” অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা ক্ষমতাসীন পক্ষও হয়তো এই নীরব অসন্তোষের গভীরতা পুরোপুরি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা যখন সুশাসন এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলোর সঙ্গে জড়িত, তখন পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

তাহলে এই গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা কি চিরকাল থাকবে? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, একটি নতুন রাজনৈতিক ফ্রন্ট বা তৃতীয় শক্তির উত্থান হতে পারে। এই ফ্রন্টটি হবে ঐতিহ্যবাহী রাজনীতির বাইরে—যারা দেশের অনির্দিষ্ট ভোটারদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করবে।

তাদের মূল এজেন্ডা হতে পারে প্রচলিত রাজনীতির বাইরে—ভারতের আধিপত্যের অবসান, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা, এবং “আওয়ামী ফ্যাসিবাদ”-এর স্থায়ী অবসান। এই এজেন্ডাগুলো সরাসরি জনগণের মনের কথা বলে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে প্রায়শই অনুপস্থিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই ফ্রন্ট দেশের বিভিন্ন মতাদর্শের গোষ্ঠী—যেমন হেফাজত ইসলাম, ইনকিলাব মঞ্চ এবং কিছু ইসলামী দল—এক ছাতার নিচে আনতে পারে, যা এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করবে।

এই সম্ভাব্য নতুন ফ্রন্টের নেতৃত্ব নিয়ে পিনাকী ভট্টাচার্য এর আলোচনায় দৈনিক আমার দেশ–এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের নাম উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি এই দায়িত্ব নেবেন কি না তা অনিশ্চিত। তাকে অনেকে “অনিচ্ছুক নেতা” (Reluctant Leader) হিসেবে বর্ণনা করছেন—যিনি ক্ষমতার জন্য নয়, বরং দেশের প্রয়োজনে এগিয়ে আসতে পারেন।

ইতিহাসে দেখা যায়, জর্জ ওয়াশিংটন, জিন্নাহ বা সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতারা প্রথমে নেতৃত্ব নিতে অনিচ্ছুক থাকলেও সময়ের প্রয়োজনে তাদের কাঁধে বিশাল দায়িত্ব এসে পড়েছিল।

মাহমুদুর রহমানের মতো একজন ব্যক্তিত্বের সম্ভাব্য উত্থান কি তবে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য তেমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই নতুন ফ্রন্ট যদি সফল হয়, তবে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারার সূচনা হবে। এর ফলে কিছু পরিচিত রাজনীতিবিদ তাদের প্রভাব হারাতে পারেন এবং প্রকৃত জাতীয়তাবাদী নেতারা ক্ষমতায় আসতে পারেন।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটি কেবল একটি নির্বাচনের পালাবদল নয়—বরং একটি জাতির মনের পরিবর্তনের মুহূর্ত। এই নীরব বিপ্লবের ঢেউ কোন দিকে বইবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এটি নিশ্চিত যে, দেশের মানুষ আজ এক নতুন বাংলাদেশ চায়—যেখানে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হবে জনসেবা, কোনো দলের বিজয় নয়।

  • এখন প্রশ্ন—এই নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট কার ঝুলিতে যাবে?
  • কোন নেতৃত্ব তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে?
  • বাংলাদেশের গণতন্ত্র কি নতুন কোনো পথে হাঁটবে, নাকি পুরোনো বৃত্তেই ঘুরপাক খাবে?

উত্তর হয়তো ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে আছে। তবে এই নীরবতা থেকে যে একটি নতুন বাংলাদেশের জন্ম হতে চলেছে, তা চিন্তার দাবি রাখে।