শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনীর ঐতিহাসিক শোকযাত্রা তেহরান থেকে মাশহাদ

৩ জুলাই, ২০২৬ - দুপুর ৩:২০
 2.3k
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনীর ঐতিহাসিক শোকযাত্রা তেহরান থেকে মাশহাদ

শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় জানাজা ও শোকযাত্রা শুরু হয়েছে। ৯ জুলাই মাশহাদে দাফন।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব এবং মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী নেতা শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর রাষ্ট্রীয় জানাজা, শোকানুষ্ঠান ও দাফন কার্যক্রম আজ শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে। দীর্ঘ চার মাস অপেক্ষার পর শুরু হওয়া এ কর্মসূচি আগামী ৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত পর্বে ৯ জুলাই, পবিত্র মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে তাঁকে দাফন করা হবে।

ইরানের সরকারি সূত্রগুলো জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে সংঘটিত হামলায় ৮৬ বছর বয়সে আয়াতুল্লাহ খামেনী শাহাদাত বরণ করেন। একই ঘটনায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও শহীদ হন। পরবর্তী যুদ্ধ পরিস্থিতি, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে তাঁর জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা কয়েক মাস স্থগিত রাখা হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হওয়া এ শোকানুষ্ঠানকে ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ৪ ও ৫ জুলাই তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ রাখা হবে। সেখানে লাখো মানুষ শেষবারের মতো তাঁদের প্রিয় নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। রাজধানীতেই অনুষ্ঠিত হবে কেন্দ্রীয় জানাজা ও বৃহৎ শোক মিছিল। ৬ জুলাই তেহরানের প্রধান সড়কগুলোতে বিশাল শোক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। ৭ জুলাই মরদেহ নেওয়া হবে শিয়া মুসলিমদের অন্যতম ধর্মীয় কেন্দ্র কোম শহরে, যেখানে বিশেষ দোয়া ও স্মরণানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ৮ জুলাই ইরাকের পবিত্র নাজাফ ও কারবালায় পৃথক শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সবশেষে ৯ জুলাই মাশহাদে দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা।

ইরানি কর্তৃপক্ষের আশা, এ শোকানুষ্ঠানে প্রায় দুই কোটি মানুষের সমাগম ঘটতে পারে, যা আধুনিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশ এবং ৩০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইরানে পৌঁছাচ্ছেন। পাকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, আর্মেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও রাজনৈতিক ও সংসদীয় প্রতিনিধিদের সফরের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বিপুল জনসমাগমকে সামনে রেখে ইরান সরকার নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইরানের পুলিশ বাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যৌথভাবে নিরাপত্তা তদারকি করছে। আকাশসীমাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষের জন্য বিশেষ বাস ও ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হোটেলগুলোতে বিশেষ ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল, মসজিদ, ক্রীড়া কমপ্লেক্স এবং সামরিক ব্যারাককে অস্থায়ী আবাসনে রূপান্তর করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানে কয়েকদিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং বড় বড় পার্কিং এলাকা থেকে বাসের মাধ্যমে মানুষকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক, কাউন্সিলর ও জরুরি সেবাদানকারী দলগুলোকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ শোকানুষ্ঠান শুধু একজন নেতার বিদায়ের আয়োজন নয়; বরং ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ, জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শন। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনীর নেতৃত্বের জন্যও এটি প্রথম বড় জনপরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই আয়োজনের মাধ্যমে তেহরান বিশ্বকে বার্তা দিতে চায় যে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি, বিপ্লবের আদর্শ এবং প্রতিরোধের চেতনা অটুট রয়েছে।

ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামী দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করবে যে শহীদ নেতার আদর্শ ও সংগ্রামের পথ থেমে যায়নি; বরং নতুন নেতৃত্বের অধীনে তা আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাবে।

১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ ৩৬ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী। তাঁর নেতৃত্বে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর ইন্তেকালে ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছয় দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে প্রস্তুত হয়েছে ইরান এবং তাঁর অগণিত অনুসারীরা।